আজ শিবের আশীর্বাদ লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন মহাশিবরাত্রি, জানুন পুজোর শুভক্ষণ ও ব্রত কথা

0

শিবের আশীর্বাদ লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন মহাশিবরাত্রি। আজ ১১ মার্চ মহাশিবরাত্রি পালিত হবে। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে মহাশিবরাত্রি উৎসব পালন করা হয়। এ বছর মহাশিবরাত্রির দিনে গ্রহের বিশেষ সংযোগও বিদ্যমান। জ্যোতিষগণনা অনুযায়ী, এদিন শিবযোগ, সর্বার্থসিদ্ধি যোগ ও ধনিষ্ঠা নক্ষত্রের উপস্থিতিতে মহাশিবরাত্রি পালিত হবে। ১১ মার্চ সকাল ৯টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত শিব যোগ থাকবে। শিবযোগে জলাভিষেক, রুদ্রাভিষেক, পুজো, আরতি বিশেষ ফলদায়ী। তার পর সিদ্ধযোগের সূচনা হবে। ১২ মার্চ সকাল ৮টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে এই যোগ। সিদ্ধ যোগে কোনও কাজ করলে তাতে সাফল্য লাভ করা যায়।  চন্দ্র মকর রাশিতে ও সূর্য কুম্ভ রাশিতে বিরাজ করবে। আবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ধনিষ্ঠা নক্ষত্র থাকবে। তার পর শতভিষা নক্ষত্র লাগবে।

মহাশিবরাত্রির ২০২১ তিথি ও শুভক্ষণ:

বৃহস্পতিবার, ১১ মার্চ মহাশিবরাত্রি পালিত হবে।

চতুর্দশী তিথি শুরু- ১১ মার্চ, বৃহস্পতিবার বেলা ২টো ৩৯ মিনিটে।

চতুর্দশী তিথি সমাপ্ত- ১২ মার্চ, শুক্রবার দুপুর ৩টে ২ মিনিটে।

নিশীথ কাল পুজো- ১১ মার্চ রাত্রি ১২টা ০৬ মিনিট থেকে ১২টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত।

প্রথম প্রহর- ১১ মার্চ, সন্ধ্যা ৬টা ২৭ মিনিট থেকে রাত ৯টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত।

দ্বিতীয় প্রহর- রাত ৯টা ২৯ মিনিট থেকে ১২টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত।

তৃতীয় প্রহর- রাত ১২টা ৩১ থেকে ৩টে ৩২ মিনিট পর্যন্ত।

চতুর্থ প্রহর- ১২ মার্চ, সকাল ৩টে ৩২ মিনিট থেকে ৬টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত।

মহাশিবরাত্রির ব্রতভঙ্গের শুভক্ষণ- ১২ মার্চ সকাল ৬টা ৩৪ মিনিট থেকে দুপুর ৩টে ০৪ মিনিট পর্যন্ত।

মহাশিবরাত্রি ব্রত কথা::

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, প্রাচীন কালে এক শিকারী ছিল। পশু হত্যা করে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ করত সে। এক মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে, সেই ঋণ শোধ করতে না-পারায় শিকারীকে শিবমঠে বন্দি করে রাখে ওই মহাজন। সেদিন মহাশিবরাত্রি ছিল। ধ্যানমগ্ন হয়ে শিবের নানান উপাখ্যান শুনতে থাকে শিকারী। চতুর্দশীর দিনে সে শিবরাত্রি ব্রত কথা শোনে। সন্ধে নাগাদ, মহাজন তাকে নিজের কাছে ডেকে ঋণ শোধের বিষয়ে বলে। পরের দিন সমস্ত ঋণ শোধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পায় ওই শিকারী। এর পর শিকারের জন্য জঙ্গলে যায় সে। কিন্তু সারাদিন বন্দির থাকার কারণে ক্ষিদে ও তেষ্টায় ব্যাকুল হয়ে পড়ে। শিকারের খোঁজে বহু দূর এগিয়ে যায় এবং রাত হয়ে যাওয়ায় জঙ্গলেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এক পুকুরের পাশে বেলগাছে উঠে রাত কাটার অপেক্ষায় বসে থাকে।

ওই বেলগাছের নীচে একটি শিবলিঙ্গ ছিল, যা বেল পাতা দিয়ে ঢাকা ছিল। চিত্রভানু তা বুঝতে পারেনি। ওই গাছে রাত্রি যাপনের জন্য সে যে সমস্ত বেলপাতা ও ডাল ভাঙে, তা শিবলিঙ্গের ওপরেই পড়তে থাকে। এ ভাবে উপবাস থেকে যায় সে এবং শিবলিঙ্গে বেলপাতাও অর্পিত হয়ে যায়। এক প্রহর রাত্রি কেটে যাওয়ার পর এক গর্ভবতী হরিণ পুকুরে জল পান করতে আসে।

হরিণ শিকারের জন্য শিকারী ধনুক তোলে, তখনই ওই হরিণ বলে, ‘আমি গর্ভবতী। শীঘ্র প্রসব করব। তুমি এক সঙ্গে দুটি জীবের হত্যা করবে, এটা অনুচিত। আমি সন্তান প্রসবের পর শীঘ্র তোমার কাছে চলে আসব। তখন তুমি আমার হত্যা করো।’ শিকারী ধনুকের রাশ আলগা করে, এ সময়ও কিছু বেলপাতা ভেঙে যায় ও শিবলিঙ্গে অর্পিত হয়। এ ভাবে চিত্রভানুর প্রথম প্রহরের পুজো সম্পন্ন হয়।

কিছু ক্ষণ পর আর একটি হরিণ সেখানে আসে। প্রসন্ন শিকারী ধনুকে তীর লাগায়। কিন্তু সেই হরিণও তাঁর কাছে আবেদন জানায়, ‘হে শিকারী। কিছু ক্ষণ পূর্বেই আমি ঋতু থেকে মুক্তি পেয়েছি। কামাতুর বিরহিণী আমি। নিজের প্রিয়র খোঁজে ঘুরছি। নিজের স্বামীর সঙ্গে দেখা করে শীঘ্র তোমার কাছে ফিরে আসব।’ তাকেও ছেড়ে দেয় সে। রাতের শেষ প্রহর ছিল সেটি। এ সময়ও ধনুকের খোঁচায় কিছু বেলপাতা শিবলিঙ্গে অর্পিত হয়ে যায় ও তার দ্বিতীয় প্রহরের পুজো সমাপ্ত হয়।

সে সময় অন্য একটি হরিণ নিজের শাবকের সঙ্গে সেখান থেকে যাচ্ছিল। সে তীর নিক্ষেপ করতে যাচ্ছিল, তখনই হরিণ বলে, ‘হে শিকারী! আমি আমার সন্তানদের তাদের বাবার কাছে পৌঁছে ফিরে আসব। এখন আমাকে মেরো না।’ শিকারী হেসে বলে যে, ‘সামনে উপস্থিত শিকারকে হাতছাড়া করার মতো বোকা আমি নই। এর আগে দুবার আমি আমার শিকার ছেড়ে দিয়েছি। আমার সন্তানরা ক্ষিদেয় কষ্ট পাচ্ছে হয়তো।’ প্রত্যুত্তরে হরিণ বলে, ‘যে ভাবে নিজের সন্তানদের মমত্ব তোমার মধ্যে রয়েছে, ঠিক তেমনই আমার মধ্যেও রয়েছে। হে শকারী। আমায় বিশ্বাস কর, এদের বাবার কাছে ছেড়ে আমি শীঘ্র ফিরে আসব। প্রতিজ্ঞা করছি।’

এর পর দয়ার বশবর্তী হয়ে সে হরিণটিকে ছেড়ে দেয়। শিকারের অভাবে ক্ষুধাতুর, ব্যাকুল শিকারী, নিজের অজান্তে বেল পাতা ভেঙে ভেঙে নিজে ফেলতে শুরু করে। কিছু ক্ষণ পর একটি হৃষ্ট-পুষ্ট মৃগ সেই পথে আসে। শিকারী ঠিক করে যে, এই মৃগকে সে হাতছাড়া করবে না। শিকার করতে প্রস্তুত হলেই, সেই মৃগ করুণ স্বরে তাঁকে বলে, ‘হে শিকারী। আমার আগে এসে থাকা তিন মৃগ ও তাঁদের সন্তানকে যদি মেরে ফেলে থাক, তা হলে আমার শিকার করতে বিলম্ব কর না। যাতে তাদের বিরহে এক ক্ষণের জন্যও আমাকে কষ্টে অশ্রুবিসর্জন না-করতে হয়। আমি তাদের স্বামী। তুমি যদি তাদের জীবন দান দিয়ে থাক, তা হলে আমাকেও কিছু ক্ষণের জন্য জীবন দান কর। তাদের সঙ্গে দেখা করে আমি তোমার কাছে চলে আসব।’

এর পর সেই মৃগকে সেই রাতের সমস্ত ঘটনাক্রম সম্পর্কে জানায়। সব শুনে ওই মৃগ বলে, ‘আমার স্ত্রীরা যে ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে এখান থেকে গিয়েছে, আমার মৃত্যুর ফলে তারা তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে না। তুমি যেমন ওদের ওপর বিশ্বাস করেছ, তেমনই আমাকেও বিশ্বাস করে যেতে দাও। তাদের সকলের সঙ্গে আমি তোমার কাছে আসব।’

শিকারী তাকেও যেতে দেয়। এ ভাবে সকাল হয়ে যায়। উপবাস, রাত্রি যাপন, শিবলিঙ্গে বেলপাতা অর্পণের মাধ্যমে অজান্তেই তার শিবরাত্রি ব্রত ও পুজ পূর্ণ হয়। তৎক্ষণাৎ সে ওই পুজোর ফল লাভ করে। শিকারীর মনও নির্মল হয়ে যায়। ভগবৎশক্তির বাস হয় তার মধ্যে।

কিছু ক্ষণ পর ওই মৃগ সপরিবার তার সামনে উপস্থিত হয়। কিন্তু পশুদের এমন সত্যতা, সাত্বিকতা ও ভালোবাসার অনুভূতি দেখে সে আত্মগ্লানিতে ভুগতে শুরু করে। সে ওই মৃগ পরিবারকে জীবনদান দেয়।

অজান্তে পালিত এই শিবরাত্রি ব্রতর কারণে শিকারী মোক্ষ লাভ করে। মৃত্যুকালে যমদূত তাকে নিতে এলে, শিবগণ যমকে ফিরিয়ে দেন এবং শিকারীকে শিবলোক নিয়ে যান। শিবের আশীর্বাদে বর্তমানের রাজা চিত্রভানু নিজের পূর্বজন্ম মনে রাখে। মহাশিবরাত্রির মাহাত্ম্য বুঝে পরবর্তী জন্মেও তা পালন করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here